যে সব দ্বন্দ্ব-বিরোধের ভেতর দিয়ে ইউরোপের চিত্তমুক্তি সূচিত ও বিকশিত হয়েছিল বঙ্গীয় রেনেসাঁ তেমন বিতর্কের জন্মই দিতে পারেনি। ব্রাহ্মণ্যবাদের বর্ণাশ্রমভিত্তিক ধর্ম-দর্শনের বিরুদ্ধে পাল্টা কোনো দর্শনের বিকাশ ঘটাতে পারেনি। রাজনীতিতে সম্প্রদায় চেতনা প্রবল হয়ে উঠেছে কিন্তু তার বাইরে সবার গ্রহণযোগ্য কোনো মতাদর্শের উন্মেষ ও বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয়নি। গণজাগরণের সংগঠক মহাত্মা গান্ধী হিন্দ স্বরাজ-এর নামে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার রূপকল্প তুলে ধরেন কিন্তু পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁকে যুগধর্মের উপযোগী হিসেবে আমলে নেননি। শিক্ষায়ন, নগরায়ন ছিল তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে। আদতে স্বাধীনতার বোধ সম্পর্কে শিক্ষিত বাঙালির মনে উপলব্ধির পার্থক্য ছিল। তাই কার্ল মার্কস ১৮৫৭ সালের সিপাহী অভ্যুত্থানকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হিসেবে দেখলেও বঙ্গীয় শিক্ষিত হিন্দুরা এ ব্যাপারে নীরব থেকেছেন। কারণ সহজেই বোধগম্য। ইংরেজ শাসককে তারা আশির্বাদ হিসেবে দেখেছেন, তাই বিদ্রোহে তার অবসান ঘটুক তা তারা চাননি। যখন অংশীদারিত্ব লাভের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়েছে, তখনই তোলা হয়েছে 'ভারত ছাড়' স্লোগান। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে ব্রিটিশদের উৎসাহে। কিন্তু হিন্দু সভ্যতার অকুণ্ঠ প্রশংসাকারী আল বেরুনী ভারতে সাম্প্রদায়িক ভেদ বুদ্ধির পরিচয় পেয়েছেন তাঁর সময়েও (৯৭৩-১০৪৮)।